বিশ্ব পরিবেশ দিবস রচনা

 বিশ্ব পরিবেশ দিবস রচনা

ভূমিকা:

পরিবেশ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন বাতাস, পানি, খাদ্য প্রয়োজন, তেমনি এই সমস্ত উপাদানগুলো পরিবেশের মাধ্যমেই আমরা লাভ করি। কিন্তু আধুনিক যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং অসচেতনতার কারণে পরিবেশ চরমভাবে দূষিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী মানুষকে সচেতন করতে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এটি পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ইতিহাস:

বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের সূচনা হয় ১৯৭২ সালে। ওই বছর জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলন (United Nations Conference on the Human Environment) সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনেই ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৭৪ সালে প্রথমবার দিবসটি উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট থিম বা প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।


দিবসটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:

  • বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো:
  • সাধারণ মানুষকে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন করা।
  • পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত করা।
  • গাছ লাগানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার (recycling) এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করা।
  • জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বন উজাড় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ও বৈচিত্র্য:

প্রতি বছর দিবসটির একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য থাকে, যা বছরের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ইস্যুকে তুলে ধরে। যেমন:

২০২৩ সালের প্রতিপাদ্য ছিল: "Solutions to Plastic Pollution" (প্লাস্টিক দূষণের সমাধান)।

২০২২ সালের প্রতিপাদ্য ছিল: "Only One Earth" (একটাই পৃথিবী)।

এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে পরিবেশের বিভিন্ন দিক যেমন বায়ু দূষণ, পানি সংকট, প্লাস্টিক বর্জ্য, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ইত্যাদির ওপর আলোকপাত করা হয়।

পরিবেশ দূষণের কারণ ও প্রভাব:

  1. বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে আমরা নিজেরাই পরিবেশ ধ্বংস করছি:
  2. বায়ু দূষণ: যানবাহন, কলকারখানা ও বর্জ্য পোড়ানোর ফলে পরিবেশে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে।
  3. পানি দূষণ: নদ-নদী ও জলাশয়ে শিল্প বর্জ্য, ময়লা এবং কীটনাশক মিশে জলজ প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
  4. মাটি দূষণ: রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
  5. বন উজাড়: কাঠের লোভে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, যার ফলে জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
  6. আবর্জনার সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব: প্লাস্টিক ও অজৈব বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না হওয়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে।

এইসব দূষণের ফলে পৃথিবীতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং, বরফ গলার হার বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, খরা ও বন্যা, প্রাণীর বিলুপ্তি এবং মানবস্বাস্থ্য সংকটে পড়ছে।

বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিবেশ দিবস:

বাংলাদেশেও বিশ্ব পরিবেশ দিবস গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়াগুলো এই দিনে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, র‍্যালি, সেমিনার ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করে। শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, দেয়ালিকা প্রকাশ, তথ্যচিত্র প্রদর্শন ইত্যাদিও হয়ে থাকে।

পরিবেশ রক্ষায় করণীয়:

  • বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের তাৎপর্য তখনই বাস্তবায়িত হবে, যদি আমরা নীচের কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করি:
  • বৃক্ষরোপণ: বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং অপ্রয়োজনে গাছ কাটার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
  • পুনর্ব্যবহার ও পুনঃচক্রায়ন: প্লাস্টিক, কাচ, ধাতব ও অন্যান্য বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য হলে সেটি ব্যবহার করা উচিত।
  • বৈদ্যুতিক শক্তির সাশ্রয়: অপ্রয়োজনীয় আলো-ফ্যান বন্ধ রাখা, সৌর শক্তি ব্যবহার করা ইত্যাদি পরিবেশবান্ধব উপায় অবলম্বন করা।
  • পরিবেশবান্ধব যানবাহন: বাইসাইকেল, ইলেকট্রিক গাড়ি কিংবা গণপরিবহন ব্যবহার করা উচিত।
  • পরিবেশ শিক্ষার প্রসার: স্কুল-কলেজে পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে পাঠ্যক্রম থাকা এবং শিশুদের ছোট থেকেই সচেতন করা দরকার।

উপসংহার:

বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল একদিন উদ্‌যাপনের বিষয় নয়, এটি হওয়া উচিত আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের চেতনা। মানুষ যদি প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করতে না পারে, তবে এই পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আসুন, আমরা সকলে মিলে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসি। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ছোট ছোট উদ্যোগ নিলে পৃথিবী আবার সবুজ ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস হোক আমাদের প্রত্যয় – "পরিবেশ বাঁচলে, পৃথিবী বাঁচবে; পৃথিবী বাঁচলে, আমরাও বাঁচব।"

Post a Comment